স্কুল বিতর্ক কী? স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতার পদ্ধতি ও ধারা

শৈশব থেকে কৈশাের মানুষের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নিজেকে তৈরি করা, মেধা ও মননে বিকশিত হবার শ্রেষ্ঠ সুযােগ এ সময়। আর এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে স্কুলজীবন। স্কুলে পাঠ্যবই শিক্ষার পাশাপাশি মনন, বুদ্ধিমত্তা ও স্বাস্থ্য বিকাশে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তােলা হয়।

এরকম একটি কার্যক্রম হলাে স্কুল – বিতর্ক।

বিতর্ক কী?

বিতর্ক হলাে যুক্তির লড়াই। যুক্তি দিয়ে গ্রহণ – বর্জনের মাধ্যমেই সমাজ ও সভ্যতা এগিয়ে চলে। এ বিশ্বজগত বিচিত্র সব বিষয়ের বিশাল ভাণ্ডার। সেই সাথে পৃথিবীর মানুষে মানুষেও রয়েছে বিস্তর ফারাক। রয়েছে মেধা, জ্ঞান, মনন আর চিন্তার বৈচিত্র্য।

এ থেকেই উৎপত্তি হয় তর্ক – বিতর্কের। আর তর্ক – বিতর্কের মধ্য দিয়েই বেরিয়ে আসে প্রকৃত সত্য – বিশ্বাস নয়, যুক্তি সেখানে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

সুতরাং বলা চলে, বিতর্ক হলাে যুক্তির মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠার একটি পন্থা। আধুনিক যুগে রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সংসদে তর্ক – বিতর্কের মাধ্যমে তা প্রকাশ পায়।

স্কুল – বিতর্কের পদ্ধতি ও ধারা

বর্তমানে বাংলাদেশে তিন ধরনের বিতর্ক প্রচলিত । স্কুল – বিতর্কেও এ তিনটি ধারা চালু রয়েছে ।

এগুলাে হলাে: সনাতনী বিতর্ক, সংসদীয় বিতর্ক এবং বারােয়ারি বিতর্ক। সনাতনী বিতর্কে একজন সভাপতি, নির্ধারিত বিচারকমণ্ডলী এবং দুটি দল থাকে। পূর্ব নির্ধারিত একটি বিষয়ের ওপর দু দল তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হয়। বিষয়টিকে বলা হয় প্রস্তাব। একটি দল প্রস্তাবের পক্ষে এবং আরেকটি দল প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। প্রত্যেক দলে সাধারণত তিন জন করে বক্তা থাকে। এদের মধ্যে একজন দলনেতা। সভাপতির মাধ্যমে প্রস্তাব উত্থাপনের পর দু দলের মধ্যে চলে তর্ক – বিতর্কের ঝড়, যুক্তি ও যুক্তি খণ্ডনের পালা । প্রত্যেক বক্তাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বক্তব্য উপস্থাপন করতে হয়। নির্ধারিত সময়ে বক্তব্য উপস্থাপনের পর দু দলের দলনেতাই যুক্তি খণ্ডনের জন্য অতিরিক্ত সময় পায় ।

সংসদীয় – বিতর্কে জাতীয় সংসদের আদলে প্রধানমন্ত্রী, বিরােধীদলীয় নেতাসহ মন্ত্রী এবং সরকারি ও বিরােধীদলীয় সংসদ সদস্য থাকে।

প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বিল আকারে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সেই প্রস্তাবের পক্ষে – বিপক্ষে চলে তর্কযুদ্ধের ঝড়।

সংসদীয় – বিতর্কে থাকেন একজন স্পিকার এবং বিচারকমণ্ডলী।

বারোয়ারি বিতর্কে কোনাে পক্ষ – দল থাকে না । স্পিকার ও বিচারকমণ্ডলী থাকেন। বিষয় কখনাে কখনাে সুনির্দিষ্ট থাকে এবং তার্কিকরা প্রত্যেকে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী বক্তব্য উপস্থাপন করেন ।

বারােয়ারি বিতর্কে খণ্ডিতভাবেও বিষয় উপস্থাপন করা হয় । যেমন: আমি হব …। এ খালি অংশটিকেই কত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারে তাই নিয়ে চলে তার্কিকদের মধ্যে প্রতিযােগিতা।

সব বিতর্কেই বিচারকদের রায়ে জয় – পরাজয়, বস্থা ইত্যাদি নির্ধারিত হয় । স্কুল – বিতর্কের বিষয় নির্বাচন করা হয় প্রতিযােগীদের বয়স উপযােগী ।

স্কুল – বিতর্কের গুরুত্ব:

স্কুল পর্যায়ে বিতর্ক চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। এর মাধ্যমে কৈশােরেই একজন শিক্ষার্থী বুদ্ধিমান, যুক্তিবাদী, বিশ্লেষণী ও সত্যানুসন্ধানী হতে শেখে। বিতর্কে অংশগ্রহণের জন্য বিতার্কিককে সাধারণ জ্ঞান ও চলতি ঘটনাবলি সম্পর্কে জানতে হয়। এতে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিধি বাড়ে। একজন ভালাে বিতার্কিক সাবলীল ও সুন্দর বাচনভঙ্গির অধিকারী হয় ।

স্কুল – বিতর্ক কেবল বক্তব্য উপস্থাপন ও যুক্তি তৈরিই শেখায় না, ব্যাপক ও বহুমুখী জ্ঞানার্জনের পথকে প্রশস্ত করে। ক্ষুদ্রতা , হীনম্মন্যতা ও কুসংস্কারাচ্ছন্নতা পরিহার করে সত্য, সুন্দর ও বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান অর্জনের দুয়ার খুলে দেয় স্কুল – বিতর্ক । সমাজ, পরিবেশ, দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, এমনকি সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন বিষয় ও ঘটনাবলি সম্পর্কে জানার আগ্রহ জাগায় স্কুল – বিতর্ক । শ্রেণিপাঠ্য বিষয়ের পাশাপাশি নিয়মিত দৈনিক পত্রিকা পড়া , খবর শােনা ইত্যাদি একজন বিতার্কিকের কাজের অনুষঙ্গা হয়ে দাঁড়ায় , যা তার মানসিক বিকাশের জন্যও জরুরি ।

স্কুল – বিতর্ক কেবল বিতর্কে অংশগ্রহণকারীদের জ্ঞানের পরিধি বাড়ায় তা নয় , বরং যারা তা শােনে তারাও উপকৃত হয় । সমৃদ্ধ হয় তাদের নিজস্ব তথ্যভাণ্ডার ।

বাংলাদেশে স্কুল – বিতর্কের চর্চা:

সারা বিশ্বজুড়েই বিতর্ক চর্চা পাঠসহায়ক কার্যক্রম হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় । স্কুল – বিতর্ক তাই স্কুল শ্রেণিকক্ষের গন্ডি পেরিয়ে আন্তঃস্কুল পর্যায়ে চলে গেছে । বাংলাদেশে বর্তমানে জাতীয় পর্যায়েও স্কুল – বিতর্ক প্রতিযােগিতা অনুষ্ঠিত হয় ।

এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে বাংলাদেশ টেলিভিশনের। এ গণমাধ্যমটিতে প্রতি বছর স্কুলএক না পর্যায়ে অনুষ্ঠিত বাংলা ও ইংরেজি বিতর্ক প্রতিযােগিতা সমপ্রচারিত হয়ে থাকে । এটি একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান হল দেশের অনেক বিতার্কিক এ ধরনের প্রতিযােগিতায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে খ্যাতিমান হয়েছেন । এই ভ বাংলাদেশে রয়েছে বিভিন্ন বিতর্ক সংগঠন । এ সংগঠনগুলােও স্কুল – বিতর্ক প্রতিযােগিতার আয়ােজন করে থাকে । পালিত হয় বিতর্ক উৎসব । এ উৎসবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্কুল , কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বক অংশ নেয় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আসেন প্রাক্তন বিতার্কিকরাও । এখানে ভাবের আদান – প্রদান হয় । কৃতী বিতাকিনের বিতর্ক দেখে ক্ষুদে বিতার্কিকরা আরও ভালাে বিতার্কিক হবার কায়দা – কানুন রপ্ত করতে শেখে ।

শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয় , আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্কুল – বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।

কুসংস্কারমুক্ত যুক্তিবাদী মন , বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা আর সত্য – সন্ধানী মানসিকতায় যার জীবনের প্রাথমিক ভিত তৈরি হয় সে সুনাগরিক হয়ে গড়ে উঠবে । এ ভিত তৈরিতে স্কুল – বিতর্কের ভূমিকা অনন্য । কেবল তর্কের খাতিরে তর্ক নয় , বিতর্ক হতে পারে স্পষ্টভাষী , সত্যনিষ্ঠ মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠার অজান। স্কুল – বিতর্ক বাড়াতে পারে স্কুল পড়ুয়াদের জ্ঞানের পরিধি , তাকে করে তুলতে পারে আত্মসচেতন , সমাজ সচেতন ও বাস্তববাদী । আর তাই বাংলাদেশের স্কুলগুলােতে বিতর্ক চর্চাকে আরও জনপ্রিয় করে তােলা প্রয়ােজন।

1 thought on “স্কুল বিতর্ক কী? স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতার পদ্ধতি ও ধারা”

Leave a Comment