রাইড শেয়ারিং কী ? রাইড শেয়ারিংয়ের নীতিমালা

বর্তমানে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস বাংলাদেশের বেশ আলােচিত একটি বিষয় । প্রথমদিকে এটি কেবল রাজধানী ঢাকাতে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন দেশের প্রায় বিশ থেকে পঁচিশটি জেলার মানুষ রাইড শেয়ারিং ‌এর সাথে পরিচিত । মূলত , আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় যানবাহনের পরিমাণ অপ্রতুল । ফলে জেলা শিলা । ৫ , মহানগর এলাকার জন্য ১০০ টি , চট্টগ্রাম মহানগরী এলাকার জন্য ৫০ টি এবং দেশের অন্যান্য মহানগর  এলাকার জন্য কমপক্ষে ২০ টি নিজস্ব বাহন থাকতে হবে । রাইড শেয়ারিং – এর আওতায় ব্যক্তিগত মােটরযান , স , কাগজপত্র যেমন রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট , ফিটনেস , ইন্স্যুরেন্স এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেটের স্থান বললে, মাইক্রোবাস এবং অ্যাম্বুলেঙ্গ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে । রাইড শেয়ারিং – এ ব্যবহৃত সকল মােটরনের । ৪২. রাইড শেয়ারিং দরের যাত্রার জন্য জনসাধারণকে যথেষ্ট ঝামেলা পােহাতে হয় । রাইড শেয়ারিং সার্ভিস অ্যাপের সাহায্যে যাত্রীরা কম সময়ে এবং সুলভ মূল্যেনির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছেন । আর তাই কর্মব্যস্ততার এই যুগে দিন দিন এই সেবার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েই চলেছে ।

রাইড শেয়ারিং কী:

রাইড শেয়ারিং সার্ভিস এমন একটি পরিবহন সেবা যেখানে মােটরযানের মালিক নিজের প্রয়ােজন মিটিয়ে স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে অনলাইন এপ্লিকেশন ব্যবহার করে ব্যক্তিগত মােটরযানকে ভাড়ায় পরিচালনা করে থাকেন । বিশ্বের বহুদেশে ইন্টারনেটভিত্তিক সফটওয়্যার এপ্লিকেশনের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস চালু রয়েছে । এ ব্যবস্থায় যাত্রী তুলনামূলক কম খরচে এবং দ্রুত নিজের গন্তব্যে পৌছাতে পারেন । এছাড়াও রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের মাধ্যমে মােটরযান মালিক সেবাদানের বিনিময়ে আর্থিক সুবিধাও লাভ করে থাকেন ।

রাইড শেয়ারিং এর ইতিহাস:

১৬০৫ সালে ঘােড়া ও ঘােড়ার গাড়ি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের সূত্রপাত ঘটে ।

১৯০৮ সালে রাইড শেয়ারিং এ প্রথম গাড়ির ব্যবহার শুরু হয় । তবে ২০০৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান উবার প্রতিষ্ঠার পর থেকেবিশ্বে রাইড শেয়ারিং ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে । এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও রাইড শেয়ারিং সেবার সূত্রপাত ঘটে ।

২০১৬ সালে স্যাম (শেয়ার এ মােটরসাইকেল) ও পাঠাও – এর মােটরসাইকেল দিয়ে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম এর যাত্রা শুরু হয় । একই বছর ২২ শে নভেম্বর উবারও দেশে প্রাইভেট করের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং ব্যবসায় শুরু করে । বর্তমানে স্যাম , পাঠাও , উবার ছাড়াও সেবাটি দিচ্ছে সহজ রাইড , ইজিয়ার রাইড , বাহন , ওভাই , ওবােন , আমার রাইড , মুভ , চলাে অ্যাপে , ট্যাক্সিওয়ালা , চালাও , ওইখালি , পিকমি , লেটস গােসহ আরও কিছু কোম্পানি । অনেক প্রতিষ্ঠান আবার নারীদের জন্য আলাদা অ্যাপ চালু করে।

সরকারি নীতিমালা:

ব্যক্তিগত মােটরযানের সংখ্যা ক্রমবৃদ্ধির প্রবণতা হ্রাস এবং যাত্রীসেবা সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকার রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা , ২০১৭ ‘ প্রণয়ন করে ।

এর মূল বিষয়গুলাে নিম্নরূপ

১. রাইড শেয়ারিং সার্ভিস পরিচালনার জন্য বিআরটিএ – এর কাছ থেকে এসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে এনলিস্টমেন্ট সনদ নিতে হবে ।

২. যিনি মােটরযানের মালিক তিনি এই সনদ নেবেন । তাছাড়া রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের টিআইএন ও ভ্যাট সার্টিফিকেট থাকতে হবে ।

৩. রাইড শেয়ারিং সার্ভিস এলাকায় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অফিস থাকতে হবে । কোনাে রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এ সেবার সাথে যুক্ত হতে চাইলে তাদের বিআরটিএ কর্তৃক নির্ধারিত নিজস্ব মােটরযান থাকতে হবে ।রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট প্রাপ্তির পর রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও চালকের মধ্যেএকটি সমঝােতা চুক্তিস্বাক্ষর করতে হবে । যেখানে সকল পক্ষের অধিকার এবং দায় – দায়িত্নের বিষয়গুলি পরিষ্কারভাবেলেখা থাকবে ।

৪. এই নীতিমালার অধীন একজন মালিক মাত্র একটি মােটরযান রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে পরিচালনা করতে পারবেন । ব্যক্তিগত মােটরযান রেজিস্ট্রেশন গ্রহণের পর প্রথম এক বছর সময় তার ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের পর উক্ত মােটরযান রাইড শেয়ারিং – এ দিতে পারবেন ।

৫. নীতিমালার অনুচ্ছেদ ঘ ‘ তে বলা আছে- রাইড শেয়ারিং এর জন্যএনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট একবারে সর্বোচ্চ তিন বছর মেয়াদে প্রদান করা যাবে । মেয়াদ শেষে তা নবায়ন করা যাবে ।

৬. নীতিমালার ‘ ভ ‘ অনুচ্ছেদে ভাড়ার বিষয়টি বলা আছে । এতে বলা হয়েছে , ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস গাইডলাইন ২০১০ অনুসারে ভাড়ার বিষয়টি নির্ধারিত হবে । এর চেয়ে বেশি ভাড়া গ্রহণ করা যাবে না । তাছাড়া নীতিমালা লঙ্ঘন করলে এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট বাতিল বলে গণ্য হবে এবং প্রচলিত আইনের দ্বারা শাস্তি প্রদান করা যাবে ।

রাইড শেয়ারিং এর সুবিধা :

যানজটের নগরী এই ঢাকা শহরে মানুষের চলাচলের একমাত্র বাহন ছিল বাস । কিন্তু যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বিভিন্নধরনের রাইড শেয়ারিং সেবা নিতে বাধ্য হয়েছে । অ্যাপভিত্তিক এসকল সেবা মানুষের সময় অনেকটাই বাঁচিয়ে দিয়েছে । যানজটে অতিষ্ঠ নগরবাসী রাইড শেয়ারিং – এর আগমনে পাবলিক ট্রান্সপাের্টের বাধা – ধরা জীবনের বাইরে চলার স্বাধীনতা ও দ্রুততা পেয়েছে । ব্যস্ত নগরীতে অফিসগামী কিংবা জরুরি প্রয়ােজনে অল্প সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের জন্য রাইড শেয়ারিং সেবার জুড়ি নেই । অটোরিকশা যেখানে আকাশ ছােয়া ভাড়া চায় সেখানে রাইড শেয়ারিং এর মাধ্যমে মানুষ কম খরচে যেতে পারছে । যারা একটু আয়েশি , গাড়ির মালিক নন, অথচ গাড়িতে চড়ার স্বাদ পেতে চান , গাড়ি কেনার ঝামেলায় যেতে চান না , অথবা পরিবারের সবাইকে নিয়েএকসঙ্গে ঘুরতে যেতে চান , এমন অনেক ক্ষেত্রেই শুধু স্মার্টফোনে অ্যাপস ওপেন করে নির্দেশনা অনুযায়ী কয়েকটি ক্লিক করলেই মিনিট কয়েক পর দোরগােড়ায় এসে হাজির হচ্ছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি ।

অসুবিধা:

তীব্র যানজট ও গণপরিবহন সংকটের সময়ে গুণগত সেবার পাশাপাশি নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে রাজধানীবাসীর কাছে অনেকটা স্বস্তি হয়ে এসেছিল অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলাে । ভালাে সেবা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলাের বিরুদ্ধে অভিযোেগ মাত্রা বেড়েই চলেছে । অল্প দিনের ব্যবধানে বেশকিছু মারাত্মক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও নিয়মনীতি মানার ক্ষেত্রে উদাসীনতাই রাইড শেয়ারিংয়ের এই পরিণতির কারণ । এমনিতেই রাইড শেয়ারিং চালুর পর থেকেই পিপীলিকার মতাে মােটরবাইক বাড়তে থাকে ঢাকা মহানগরীতে । তাদের যেমন খুশি তেমন চলা তছনছ করে দিচ্ছে ট্রাফিক – শৃঙ্খলা । সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলাের দায়িত্বহীনতা, ভুয়া আইডি ও ভুয়া ঠিকানার ছড়াছড়ি । সাম্প্রতিক সময়ে অ্যাপভিত্তিক এ পরিবহন সেবায় ভােগান্তির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা ।

অতিরিক্ত ভাড়া দাবি , অ্যাপ নির্দেশিত সােজা পথে না গিয়ে ঘুরপথে গন্তব্যে যাওয়া , যাত্রা শুরুর আগেই রাইড চালু করা এবং কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যেযেতে অস্বীকৃতিসহ অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযােগ রয়েছে চালকদের বিরুদ্ধে ।

সীমাবদ্ধতা ও উত্তরণের উপায় :

রাইড শেয়ারিং সার্ভিস একটি কল্যাণমূলক পরিবহন সেবা ব্যবস্থা । তবে এ বন্যায় বেশকিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে । এগুলােকে অতিক্রম করতে না পারলে জনসাধারণ একটি আরামদায়ক সেবা কার্যক্রম থেকে বিরত হবে । রাইড শেয়ারিং সার্ভিস প্রদানকারী অনেক চালক অদক্ষ । ফলে চালক ও যাত্রীর নিরাপত্তাব্যক্তিগত মােটরযানের সামিত ব্যবহারের কারণে দেশে হালকা মােটরযানের সংখ্যা দিন দিন বৃস্থি পাচ্ছে । ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে । তৰে যথাযথ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে রাইড শেয়ারিং সাভিসপরিচালনা করলে একদিকে যেমন ব্যক্তিগত রেহানের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাবে, পাশাপাশি এটি যানজট হ্রাসেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে ।

এছাড়া রাইড শেয়ারিং যার ফলে দেশের অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানের সুযােগ হয়েছে । ভবিষ্যতে এই সুযােগ আরও বৃদ্ধি হবে না।

শেয়ারিং সার্ভিস একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। তাই ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই এ বিষয়ে চালকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে । তারা যেন নিজের ও যাত্রীর নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন হাজে । রাইড শেয়ারিং সেবার ওপর ভ্যাট যুক্ত করা হয়েছে । এই ভ্যাট যাত্রীদের ওপর বর্তাবে । ফলে সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচ বাড়বে ।

বিশেষজ্ঞদের মতে , রাইড শেয়ারিং সার্ভিসকে আরও সুলভ ও কল্যাণকর করে তুলতে হলে একে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখা উচিত । এক গাড়ি এক অ্যাপ নীতিমালায় চালকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন । তাঁদের আয় কমে যাবে । এক গাড়ি এক অ্যাপ নীতির ফলে চালকেরা কেবল সে প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হবেন , যেটা সবচেয়ে বড়াে । এতে একচেটিয়া বাজার তৈরি হবে । সুস্থ প্রতিযােগিতামূলক বাজার তৈরিতে এক গাড়ি এক অ্যাপ নীতি সংশােধন করতে হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা । এছাড়াও রাইড শেয়ারিং সার্ভিসকে আরও জনপ্রিয় ও ব্যবহারােপযােগী করতে রাইড শেয়ারিং অ্যাপে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা প্রয়ােজন ।

২০১৭ সালের রাইড শেয়ারিং নীতিমালার অনুচ্ছেদ ‘ চ ’ – এর ৭ – এ বাংলা ভাষা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে । এবং যানজট সৃষ্টি করছে । এতে জনসাধারণের মূল্যবান শ্রম – ঘন্টা ও জ্বালানির অপচয় হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশও

Leave a Comment