রচনা: ডিজিটাল বাংলাদেশ (Digital Bangladesh)

ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রবন্ধ রচনা, রচনা: ডিজিটাল বাংলাদেশ ।

ডিজিটাল বাংলাদেশ

ভূমিকা:

মহান মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ । ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বর্তমানে একটি উন্নয়নশীল দেশ । প্রতিষ্ঠার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে গড়ে তােলার সংগ্রাম শুরু হয় । স্বাধীনতার ৪৮ বছর অতিবাহিত হলেও একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি সাধিত হয়নি । এর কারণ হচ্ছে – আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অগ্রসর না হওয়া , নৈতিকতার অভাব , দক্ষ জনশক্তি গড়ে না তােলা , বৈষম্য ইত্যাদি । উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাই সৃষ্টি হয়েছে মন্থরতা । এই মন্থরতা কাটাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে ডিজিটাল পদ্ধতি ।

ডিজিটাল বাংলাদেশ
ডিজিটাল বাংলাদেশ রচনা

ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য:

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে ২০২০ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তােলার যুগান্তকারী ঘােষণা দিয়েছেন । এ ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে আমরা বুঝি সারা দেশে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে আধুনিক কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সিস্টেমের মাধ্যমে অর্থাৎ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গতিশীল করে তােলা । দেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রত্যাশা একটি ক্ষুধা – দারিদ্র্যমুক্ত , সুখী – সমৃদ্ধ , বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের । আর সেই রাষ্ট্রটির মূল চালিকাশক্তি হবে ডিজিটাল প্রযুক্তি । ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে জনগণের জীবনযাত্রার মান সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া , প্রযুক্তিনির্ভর জীবনধারা গড়ে তােলা , জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তােলাই ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য । ইতােমধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তােলার লক্ষ্যে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তােলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে ।

শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটাল বাংলাদেশ:

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরােপ করা প্রয়ােজন । কারণ শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড । শিক্ষাথীদের জ্ঞানের বিস্তার ঘটানাের জন্য একজন শিক্ষক তার শিক্ষণীয় বিষয় কিংবা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ । ডকুমেন্টারি প্রজেক্টরের মাধ্যমে বড় পর্দায় প্রদর্শন করতে পারেন । যাতে পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জ্ঞান লাভ করতে পারে । নিজস্ব বই না থাকলেও , লাইব্রেরিতে যাওয়ার প্রয়ােজন হয় না । ওয়েবসাইট থেকে খুঁজে নিয়ে তা পড়ে ফেলা যায় । চিকিৎসা ব্যবস্থায় চিকিৎসা ক্ষেত্রে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার এক নতুন বিস্ময় ও যুগান্তর এনে দিয়েছে । বিজ্ঞানীদের সাধনায় একদিকে যেমন আবিস্কৃত হয়েছে নানা জটিল রােগের ওষুধ , রােগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সকল পরীক্ষায় (টেস্ট) আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে । এ ছাড়া ইন্টারনেট সংযােগের মাধ্যমে ডাক্তারের কাছে সরাসরি উপস্থিত না হয়েও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফি পরিশােধ করে ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করা যায় ।

কৃষিক্ষেত্রে ডিজিটাল বাংলাদেশ:

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কৃষিখাতে প্রযুক্তির ব্যবহারের কোনাে বিকল্প নেই । ইতােমধ্যেই বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে কৃষিতে যুগান্তকারী পরিবর্তনএসেছে । বিলিলের বদৌলতােউদ্ভাবিত হয়েছে উন্নত জাতের বীজ , পরিবেশবান্ধব সার ও উচ্চ ফলনশীল প্রজাতির শস্য । অনাবৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাও উদ্ভাবিত হয়েছে । যথার্থ প্রশিক্ষণ নিয়ে শিক্ষিত জনগােষ্ঠী কৃষির উন্নয়নে ভূমিকা পালন করলে এক্ষেত্রে যে আরও সফলতা আসবে সেটি নিশ্চিত করেই বলা যায় ।

অফিস-আদালতে:

বাংলাদেশের অধিকাংশ অফিস – আদালতে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিরাজ করছে । সেখানে কাজের অত্যন্ত মন্থর গতি আর সর্বক্ষেত্রে ওৎপেতে আছে দুর্নীতির কালাে থাবা । অফিসগুলােতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে কম্পিউটার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একস্থানে বসে প্রশাসনকে গতিশীল , কর্মমুখী ও দুনীতিমুক্ত করা সম্ভব ।

নিরাপত্তা বিধানে:

কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে সর্বক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভব । ব্যাংক , আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে । ভিডিও ফুটেজ দেখে এখন অপরাধীকে চিহ্নিত করা সম্ভব । ফলে কোনাে দুষ্কৃতকারী অঘটন ঘটিয়ে পার পায় না । তবে এসবের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যাদের হাতে থাকে তাদেরও সৎ হতে হবে ।

যােগাযােগ ব্যবস্থায় ডিজিটাল বাংলাদেশ:

বর্তমানে কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সাহায্যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যােগাযােগ ব্যবস্থার অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে । বিশেষ করে আকাশপথ এখন কম্পিউটার দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে । বিভিন্ন গ্রহে রকেট উৎক্ষেপণ করা হলে যােগাযােগ থাকছে কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সাথে । নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সমুদ্র পথও । মুহুর্তের মধ্যে এক দেশের সাথে আরেক দেশের যােগাযােগ স্থাপিত হচ্ছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে । এ ব্যবস্থায় শুধু সারাদেশ নয় , বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা যায় ।

প্রকাশনা ও সংবাদপত্র শিল্পে:

বই – পুস্তকসহ প্রকাশনার সকল ক্ষেত্রে অনেক আগেই আমাদের দেশে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের ব্যবহার শুরু হয়েছে । আগেকার দিনের মুদ্রণব্যবস্থার কথা ভাবলে সেটি এখন অকল্পনীয় মনে হয় । বর্তমানে দু’মাসের কাজ দু’দিনেই করা সম্ভব । আবার বিভিন্ন প্রকাশনার বই ই – বুক আকারে তাদের ওয়েব সাইটে পাওয়া যাচ্ছে । সংবাদপত্র শিল্পেও কম্পিউটার এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে । ইন্টারনেটের মাধ্যমে একটি সংবাদপত্র একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রকাশিত হচ্ছে । আবার বিদেশি পত্রিকাগুলাে আমরা পড়তে পারছি।

বিনােদনের ক্ষেত্রে:

বিনােদন মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ । বিনােদনের ক্ষেত্রে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে । খেলাধুলা , সিনেমা ইত্যাদি থেকে শুরু করে নানা ধরনের আনন্দ উপভােগ করা যাচ্ছে কম্পিউটারের মাধ্যমে । খেলা যাচ্ছে নানা ধরনের গেম । ইউটিউবে বিষয় লিখে সার্চ দিলে মুহূর্তে হাতের নাগালে চলে আসে সবকিছু । সংগীতপ্রিয় মানুষ ইন্টারনেটের সাহায্যে তাদের মনের মতাে বাছাই করা গান উপভােগ করে থাকে । পুরােনাে দিনের গান , মুভি সবই পাওয়া যায় এখানে ।

ইউনিয়ন পর্যায়ে তথ্য কেন্দ্র:

তথ্য জানার অধিকার সকল নাগরিকের । এই সেবা মানুষের দোরগােড়ায় পৌছে দেওয়ার জন্য সরকার দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠা করেছে তথ্যকেন্দ্র । এই কেন্দ্রে নিযুক্ত কর্মকর্তা অপারেটর চাহিদা অনুযায়ী তথ্য দিয়ে সহায়তা করে থাকে । ফলে মানুষকে আগের মতাে কোনাে কাজে ভােগান্তিতে পড়তে হয় না । কাজে নামার আগে তারা প্রযােজনীয় তথ্য জেনে যায় । এসব তথ্যকেন্দ্র থেকে মানুষ বিভিন্ন ডাটা বা তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে । জানতে পারবে সর্বশেষ প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থা ও অবস্থান ।

উপসংহার:

বাংলাদেশ একটি অপার সম্ভাবনার দেশ । প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর দেশটিকে উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে হলে সর্বক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটাতে হবে । আর উন্নয়ন ঘটাতে হলে কাজের কোনাে বিকল্প নেই । জনশক্তিকে দক্ষ করে গড়ে তুলে তাদের দেশের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে । প্রশাসনকে করে তুলতে হবে কার্যকর ও গতিশীল । অগ্রসর হতে হবে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে । তবেই প্রতিষ্ঠিত হবে কাঙ্ক্ষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ।

Also Read

Leave a Comment