বাংলাদেশের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি হলাে প্রাথমিক শিক্ষা । জাতীয় আশা – আকাঙ্ক্ষা এবং আদর্শের প্রতিফলন ঘটে প্রাথমিক শিক্ষায় । প্রাথমিক শিক্ষা যে দেশে যত সুষ্ঠুভাবে দেওয়া হয় সে দেশ তত বেশি উন্নত । প্রাথমিক শিক্ষা মান সম্পন্ন না হলে তা দেশের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলে দেয় । আবার দেশের সকল নাগরিকের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত না করলে একটি দেশ কখনােই উন্নতি করতে পারে না ।

এই বিষয়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করে সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে ।

প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাস : প্রাচীনকালে ও মধ্যযুগে ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা প্রধানত আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিল । এই শিক্ষাব্যবস্থাটি সাধারণ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল ।

বর্তমানে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা হিসাবে পরিচিত শিক্ষাব্যবস্থাটির গােড়াপত্তন ও বাস্তবায়ন করেন একজন ব্রিটিশ । উইলিয়াম অ্যাডামস তাঁর শিক্ষা প্রতিবেদনে , নিম্নলিখিত বিষয়গুলাের প্রতি বিশেষ জোর দিয়েছিলেন : জেলাভিত্তিক শিক্ষা – সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ । মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তকের প্রচলন । শিক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতি জেলায় ইন্সপেক্টর নিয়ােগ । শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য সাধারণ বিদ্যালয় স্থাপন । জমিদাতাকে শিক্ষকতা পেশায় নিয়ােগদান করে উৎসাহিত করা । প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে বৃত্তি পরীক্ষার প্রচলন ।

১৮৫৪ সনের উডের ডেসপ্যাচ তত্ত্ব ছিল ব্রিটিশ শাসক কর্তৃক বাংলার শিক্ষা ব্যবহার আধুনিকীকরণ করার প্রক্রিয়ার একটি উদ্ধৃষ্টতম উদাহরণ । ১৮৫৫-৫৬ সময়কালের মধ্যে এই তত্ত্বের সুপারিশ অনুযায়ী , পাবলিক ইন্সট্রাকশন বিভাগ নামে নতুন একটি বিভাগ চালু করা হয় । উডের ডেসপ্যাচ তত্ত্বে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনেও উৎসাহিত করা হয় । সেসময় লর্ড কার্জন প্রাথমিক শিক্ষা প্রসারে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ।

১৯১০ একটি রেজুলেশন জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনে ( ১৯৪৭ ) উপস্থাপন করা হয় । ১৯৫৭ সনে সরকার জেলা স্কুল বাের্ড । হবে ১৯১৭ সনে বিলটি খারিজ হয়ে ঘম্বিয় । ১৯২১ সনের ইন্ডিন পুস্তক আইনে সীমিত আকারে আষাক্তশালনের মনে গোপালকৃষ্ণ গােখলে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার জন্য আইন পরিষদে একটি বিল উত্থাপন করেন । মহান রাখা হয় , ১৯৩০ সনে বেঙ্গল ( পাল্প এলাকা ) প্রাথমিক শিক্ষা আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল । তারপরের দশকে এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনাে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি ।

এই আইনের অধীনে শিক্ষা সম্প্রসারণ , পরিচালনা , ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য , বিনামূল্যে এবং সর্বজনীন বাধ্যতামূলক শিক্ষার লক্ষ্য পূরণে জেলা স্কুল বাের্ড গঠন করা হয় ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর , শিক্ষা উন্নয়নের জন্য সার্জেন্ট কমিশনের রিপাের্ট ( ১৯৪৪ ) প্রকাশিত হয় । এটাই সার্জেন্ট কমিশনের রিপাের্ট বাস্তবায়ন বন্ধ হয়ে যায় । ছিল প্রথম রিপােট যাতে প্রাক – প্রাথমিক শিক্ষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় ।

১৯৪৭ সনে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলে , শাকিস্তান আমলে প্রাথমিক শিক্ষা : ভারত বিভক্তির পর , সর্বজনীন বাধ্যতামূলক এবং বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য । 1 দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ , পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ওপর ন্যস্ত করে । এরই ধারাবাহিকতায় সাবেক জেলা স্কুল ইন্সপেক্টরগণ জেলা প্রশাসকদের অধীনে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে নিয়ােগপ্রাপ্ত হন । ১৯৫১ সনে বেঙ্গল ( পল্পি এলাকার ) প্রাথমিক শিক্ষা আইন সংশােধন করা হয় ।

ইউনিয়নের ৫,০০০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নির্বাচন করা হয় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা পরিচালনা করার জন্য । বাকিগুলােতে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়নি । ১৯৫১ সন পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা ৪ বছর মেয়াদি কোর্স লি । ১৯৫২ সনে প্রাথমিক শিক্ষাকে ৫ বছর মেয়াদি কোর্সে রূপান্তর করা হয় ।

বাংলাদেশে বাধ্যতামূলক শিক্ষার প্রেক্ষাপট: মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব । বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদের ক , খ ও গ – এই তিনটি উপ – অনুচ্ছেদে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে বলা হয়েছে । সংবিধান অনুসারে সবার জন্য একই ধারার মানসম্পন্ন বুনিয়াদি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে । এ ছাড়াও ১৯৭৪ সালের প্রথম জাতীয় শিক্ষা কমিটি প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছিল । ২ য় পত্মবার্ষিক পরিজ্ঞনায় (১৯৮১-৮৫) সর্বজনীন অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয় ।এরপর ১৯৯০ সালে। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন প্রণীত হয় । ১৯৯২ সালে দেশের ৬৮ টি থানায় এই আইনটি চালু করা হয় । এবং ১৯৯৩ সালের ১ লা জানুয়ারি থেকে সারাদেশে আইনটি কার্যকর করা হয় । ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে ২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরতা দূরীকরণের কথা বলা হয় ।

প্রাথমিক শিক্ষার উপযােগিতা : জাতীয় জীবনের সকল সমস্যা সমাধানের এক বড়াে সহায়ক শক্তি হলাে শিক্ষা । কৃষি , ক্তি , স্বাস্থ্য , পরিবার – পরিকল্পনা সকল ক্ষেত্রকেই বাধাগ্রস্ত করে নিরক্ষরতা । এক্ষেত্রে জাতি যদি শিক্ষিত হয়ে ওঠে তবে এসব সমস্যার সমাধান খুব সহজেই সম্ভব হবে । প্রাথমিক শিক্ষা শুধু একটি শিশুর মানবিক গুণাবলি অর্জনের জন্যই প্রয়ােজনীয় নয় , দেশের আর্থ – সামাজিক উন্নতি ও অগ্রগতির জন্যও এটি অপরিহার্য ।

এটি শুধু মানুষকে সাক্ষরতা এবং ভাষাজ্ঞানের শিক্ষা দেয় না , একইসাথে তার বিচার – বুদ্ধিরও বিকাশ ঘটায় । বিশ্ববাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় , প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ব্যক্তির আয় প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত নয় এরূপ ব্যক্তি অপেক্ষা ৫২.৬ % বেশি ।

প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা : বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে প্রায় দুই যুগ আগে । কিন্তু তারপরও এর সাফল্য কাক্ষিত মাত্রায় পৌছায়নি । ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে , এদেশে সাক্ষরতার হার ৫১,৮ % । অন্যদিকে , ২০১৩ সালের বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ব্যুরাে ( ব্যানবেইস ) এর হিসাব অনুসারে , এ হার ৬৫.৫ ভাগ । প্রাথমিক শিক্ষায় শিশু ভর্তি হার ৯৯.৪৭ ভাগ হলেও ঝরে পড়ার হার ২১ ভাগ । এ কারণে এখনাে বিপুল সংখ্যক শিশু প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ৫৪%।বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধকতাসমূহ : বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ একটি উন্নয়নশীল দেশ । এদেশের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ উপযােগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি । সীমিত সম্পদ , অবকাঠামােগত সমস্যা , দারিদ্র্য প্রভৃতি কারণে প্রাথমিক শিক্ষায় অর্জন সন্তোষজনক নয় । সবার জন্য মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তার মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলাে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও মানসম্পন্ন শিক্ষকের স্বল্পতা ।

  • শহর ও গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষার মানের ব্যবধান ।
  • ঝরে পড়া শিক্ষার্থী । শিক্ষার্থীদের কম উপস্থিতি ।
  • সনাতন পরীক্ষা পদ্ধৃতি । শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব । বিদ্যালয়ের পরিবেশ । এ ছাড়াও শিক্ষকদের অপর্যাপ্ত বেতন , ভাতা ও পদমর্যাদা , লােকবল সমস্যা , পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণের অভাব , অভিভাবকদের দারিদ্র্য ও অসচেতনতা , ব্যাপক দুর্নীতি ও ঘুষ ইত্যাদি কারণে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম বর্তমান অবস্থায় করণীয় : প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক মানােন্নয়নে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক তা হলাে শিক্ষার্থীর চাহিদাকে সামনে রেখে পর্যাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণ করা । শিক্ষার্থীদের জন্য আবশ্যক ভোঁত সুযােগ – সুবিধা এবং শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করা।
  • পর্যাপ্ত সংখ্যক যােগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া এবং তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা । আধুনিক ও যুগােপযুগী শিক্ষা পদ্ধতি প্রণয়ন করা ।
  • প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতি এবং উচ্চতর বেতনস্কেল প্রদান করা । ডিজিটাল ক্লাসরুমের ব্যবস্থা করা ।
  • ঘুষ , দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করা ।

বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয় । এজন্য প্রয়ােজন জাতীয় অঙ্গীকার , জনসাধারণের অংশগ্রহণ এবং ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা । আমরা যদি দেশের স্বার্থে , নিজেদের মঙ্গলের জন্য শিক্ষার একটা শক্তিশালী ভিত্তি রচনা করতে চাই , তবে সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়ােজন ।

Leave a Comment