বই পড়ার উপকারিতা, প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব এবং আনন্দ

মানুষ যতভাবে আনন্দ লাভ করতে পারে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে বই পড়ার মাধ্যমে আনন্দ লাভ ।

মানব সভ্যতার ইতিহাস বিনির্মাণ করেছে বই । একটি জাতির কৃষ্টি – সংস্কৃতিকে ধারণ করে বই । বইয়ের মধ্যেই লিপিবদ্ধ থাকে ইতিহাস , ঐতিহ্য , সংস্কৃতি । সঙ্গত কারণেই বইপাঠের মাধ্যমে ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায় ।

বই পড়ার মাধ্যমে মানুষের চিত্ত প্রফুল্ল হয় , মানুষ পরিশীলিত হয় । বই যদি কারাে সঙ্গী হয়ে উঠে তবে বইয়ের সাহচার্য তাকে অনাবিল আনন্দ দান করে ।

বইয়ের প্রয়ােজনীয়তা :

খাদ্য গ্রহণ না করলে যেমন মানুষের দেহ বাঁচে না , তেমনি মনের দাবি পূরণ না করলে আত্মা বাঁচে । বিখ্যাত ঔপন্যাসিক তলস্তোয় বলেছেন , “ জীবনে তিনটি বস্তুই বিশেষভাবে প্রয়ােজন , তা হচ্ছে বই , বই এবং বই । ”

মানুষ তার জ্ঞানকে , বােধকে অক্ষরের ভাষায় লিপিবক্ষ্য করে বইয়ের মাধ্যমে যুগ – যুগান্তরের মানুষের জ্ঞান ও আনন্দলাভের জন্যে রেখে যেতে পারে । সমস্ত প্রাণীজগতের সাথে মানুষের পার্থক্য এইখানে ।

বিশ্বের মহামূল্যবান গ্রন্থগুলাে মানুষের জ্ঞান – বিজ্ঞান , শিল্প – সাহিত্য সাধনার নির্বাক সাক্ষী । কালান্তরে মানুষ বই পড়ার মধ্য দিয়েই লাভ করেছে তার আপন সত্তার পরিচয় । বই নানাভাবে মানুষের প্রয়ােজন মেটায় ।

সভ্যতা সংস্কৃতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে বই।

কৌতূহল নিবারণে বই :

বৈচিত্র্যময় এ বিশ্ব – ব্রহ্মাণ্ডের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে নানা বিস্ময় । অজানা , অদেখা বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে চকিতে ধারণা দিতে পারে বই ।

বইয়ের মাধ্যমে মানুষ সমগ্র বিশ্বকে জানতে পারে । জ্ঞানের জগতে অবগাহন করে মানুষ লাভ করে জীবনের প্রকৃত মহিমা ।

তাইতাে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন বিশাল বিশ্বের আয়ােজন ; মাের মন জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্র তারি এক কোণ । সেই ক্ষোভে পড়ি গ্রন্থ ভ্রমণবৃত্তান্ত আছে যাহে অক্ষয় উত্সাহে।

নিঃসঙ্গতা ঘােচাতে বই :

জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় মানুষ কখনাে কখনাে নিসঙ্গ হয়ে পড়ে । একাকী মানুষের নিঃসঙ্গতা দূর করতে পারে বই ।

জনহীন দ্বীপে নির্বাসিত জনের নিঃসঙ্গতার বেদনাও দূর হয়ে যেতে পারে যদি তার কাছে থাকে কিছু বই ।

রবীন্দ্রনাথ , নজরুল , বিভূতিভূষণ , শেক্সপিয়র , গ্যেটে , ওয়ার্ডসওয়ার্থ , শেলি , দস্তয়ভস্কি কিংবা গাের্কির মতাে সাহিত্যিকদের বই পাঠকের অন্তরকে অপরিমেয় আনন্দে ভরিয়ে তােলে । বইপ্রেমীরা বইয়ের মধ্যে খুঁজে পায় বেঁচে থাকার প্রেরণা ।

অনাবিল আনন্দ লাভে বই :

মানুষের জীবনে নানা উত্থান – পতন আসে । নানা ঘাত – প্রতিঘাতে মানুষ কখনাে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে , হতাশার চোরাবালিতে ডুবে জীবন হয়ে যায় মরুভূমির মতাে । এই চোরাবালি থেকে মানুষকে উদ্ধার করতে পারে ভালাে কোনাে বই ।

ভালাে বই মানুষকে দেয় অনাবিল আনন্দ । সত্য , জ্ঞান ও আনন্দের আলাে মানুষের জীবনে পূর্ণতা দেয় । জ্ঞান – সাধনা ও শিল্প – সাধনা মানুষকে প্রতিদিনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দেয় ।

প্রতিদিনের কর্মক্লান্ত দিনের ব্যস্ততা , হানাহানি ও সমস্যাক্রিষ্ট জীবনের নাগপাশ থেকে বই দেয় নির্মল আনন্দ । বার্ট্রান্ড রাসেলের মতে , সংসারের জ্বালা – যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে মনের ভেতর আপন ভুবন সৃষ্টি করা এবং বিপকালে তার ভেতর ডুব দেওয়া । যে যত বেশি ভুবন তৈরি করতে পারে , যন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার তত বেশি হয় । দুঃখ – বেদনার মুহূর্তে , মানসিক অশান্তিতে ও দুর্বলতার সময়ে বই মানুষের মনে শান্তি ও প্রেরণা জোগায় ।

সংস্কৃতি বিকাশে বই :

ভালাে বইয়ের উপযােগীতার কথা বলে শেষ করা যায় না । দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টালে জীবন পাল্টে যায় । আর দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টাতে সাহায্য করে বই । অতীত , বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করে কালজয়ী সাহিত্য ও গ্রন্থসমূহ ।

গ্রন্থের সাহচর্যেই মানুষ অগ্রসর হয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্রমউল্কর্ষের পথে । সভ্যতার অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয়েছে শিল্পকলা ও সাহিত্য , সৃষ্টি হয়েছে জ্ঞান – বিজ্ঞান ।

আজকের দিনে হােমার , ভার্জিল , দান্তে , গ্যেটে , শেকসপিয়র , দস্তয়ভস্কি আর রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ পাওয়া সম্ভব নয় ।

সুযােগ নেই মাদাম কুরি , মার্কনি , এডিসন , জগদীশ চন্দ্র বসুকে কাছে পাবার ।

কেবল বইয়ের মাধ্যমেই তাদের সাথে সংযােগ ঘটানাে যেতে পারে । পাওয়া যেতে পারে তাদের সান্নিধ্য । বইয়ের মাধ্যমেই এই সব মনীষীর চিন্তাধারার সাথে পরিচিত হয়ে লাভ করতে পারি জ্ঞান , আনন্দ ও পরিতৃপ্তি

মানুষকে পরিশীলিত করে বই :

বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক ও ভৌগােলিক বৃত্তান্ত , সামাজিক আচার – আচরণ , বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার , দুঃসাহসিক অভিযান ও ভ্রমণবৃত্তান্ত পাঠ করে মানুষ উদার হতে পারে । মানুষের মাঝে জন্ম নেয় এক পরিশীলিত মানুষ ।

ভালাে বই কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনকে শুদ্ধ করে , মানুষ খুঁজে পায় যথার্থ মানুষ হয়ে ওঠার উপায় । তার মাঝে শুরু হয় মুক্তবুদ্ধির চর্চা । গ্রন্থরাজির মধ্যে এসে মেশে বিভিন্ন জাতির জ্ঞান – বিজ্ঞান , শিল্প – সাহিত্যের বহুমুখী স্রোতধারা ।

মনীষী কার্লাইল তাই তার ‘On the choice of books’ প্রবন্ধে বলেছেন , ‘ The true university of our days is the collection of books .

বই প্রসঙ্গে কবি ওমর খৈয়ামের দৃষ্টিভঙ্গী ছিল অসাধারণ ।

তিনি বলেছেন , “ রুটি – মদ ফুরিয়ে যাবে , প্রিয়ার কালাে চোখ ঘােলাটে হয়ে আসবে কিন্তু বই অনন্ত – যৌবনা যদি তেমন বই হয় । ” কত বরেণ্য মানুষের পদচিহ্ন পড়েছে এই পৃথিবীতে । তাদের জীবনগাঁথা বর্ণিত হয়েছে শত শত বইয়ের পাতায় পাতায় ।

বই পড়েই মানুষ সমৃদ্ধ হয় ; আলােকিত হয় । বই পড়ে জীবনকে উদ্ভাসিত করার চেয়ে আনন্দের আর কিছু হতে পারে না ।

বই পড়ার মধ্য দিয়ে মানুষ যে জ্ঞানসাধনা করে , তা মানুষকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায় । জীবন হয়ে ওঠে নদীর মতাে ৰহমান , প্রকৃতির মতাে নির্মল ।

Leave a Comment