প্রবন্ধ রচনা লেখার নিয়ম – পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য

কোনাে বিষয় নিয়ে চিন্তামূলক আলােচনাই প্রবন্ধ। এ দুটো দিক থেকে প্রবন্ধ হতে পারে দু রকম : এক হয় প্রকৃষ্ট বন্ধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ গদ্য রচনা ।

তা হতে পারে কোনাে কিছুর বিবরণ বা বর্ণনা , হতে পারে । ক . লঘু প্রবন্ধ থ , ভাবগম্ভীর প্রবন্ধ ।

ক. লঘু প্রবন্ধ

লঘু প্রবন্ধ সাধারণত বর্ণনাধর্মী হয়ে থাকে । এ ধরনের রচনা যেকোনাে পরিচিত বিষয় নিয়ে লেখা যায় । এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ধারণা , অভিজ্ঞতা , মতামত ইত্যাদি স্বচ্ছন্দে প্রকাশ করা চলে । এ জাতীয় লেখার ধরন সাধারণত হালকা হয় ; চাল হয় লঘু । গদ্য হওয়া উচিত সরল ও ঝরঝরে । এতে তা পড়তে ভালাে লাগে । এ ধরনের রচনা গাধা হলে চলে না । তাতে লেখকের ব্যক্তিগত পছন্দ – অপছন্দ স্বচ্ছন্দে প্রকাশ করা চলে । এভাবে প্রত্যেকটি রচনা হয়ে ওঠে অন্য রচনা থেকে একেবারে আলাদা । এ ধরনের রচনায় কোনাে কিছু বর্ণনা করার সময়ে এমনভাবে করতে হয় যেন সব কিছু ছবির মতাে ফুটে ওঠে । তাতে যেন বর্ণ , গন্ধ , স্বাদ , ধ্বনি ইত্যাদিও অনুভব করা যায় ।

যেকোনাে পরিচিত বিষয় নিয়ে এ ধরনের প্রবন্ধ লেখা চলে । পরিচিত প্রকৃতি , পশুপাখি , গাছপালা , মানুষজন যা নিয়েই লেখা হােক না কেন তাদের সব বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করা উচিত।

খ. ভাবগম্ভীর প্রবন্ধ

এ ধরনের রচনা সাধারণত চিন্তামূলক হয়ে থাকে । তাতে থাকে নানা তত্ত্ব ও তথ্য । মানব চরিত্রের নানা বৈশিষ্ট্য , নানারকম ভাব – ধারণা , সমাজ ও সংস্কৃতির নানা বিষয় নিয়ে আলােচনা এ ধরনের রচনার মধ্যে পড়ে ।

এ ধরনের রচনায় লেখকের ব্যক্তিগত পছন্দ , অভিজ্ঞতা , স্মৃতি ইত্যাদি প্রকাশের সুযোেগ তেমন থাকে । তবে প্রবন্ধকারের চিন্তা ও অভিমত এতে কখনাে কখনাে থাকতে পারে ।

প্রবন্ধ রচনার কৌশল:

১. মালা গাঁথতে হলে যেমন নানারকম ফুল সংগ্রহ করতে হয় , প্রবন্ধ রচনা করতে হলেও তেমনি নানা চিন্তা – ভাবনা ও তথ্য জোগাড় করতে হয় ।

কোনাে বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতে হলে সে বিষয়ে যে সব চিন্তা ও তথ্য মাথায় আসে । সেগুলাে সংকেত সূত্র হিসেবে প্রথমে খসড়াভাবে টুকে রাখবে । ঐ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কোনাে বই , পত্র – পত্রিকার সাহায্য নিয়ে ৰা শিক্ষক – শিক্ষিকা , মা – বাবা বা অন্য কারও সঙ্গে আলােচনা করে তথ্য সংগ্রহ করে তাও টুকে রাখৰে ।

এগুলাে হলাে তােমার প্রবন্ধ রচনার উপকরণ ।

২. মালা গাঁথার সময় যেমন এক এক রঙের ফুলকে অন্য রঙের সঙ্গে মিলিয়ে সাজাতে হয় তেমনই প্রবন্ধ লেখার সময় প্রবন্ধের এক একটা দিককে গুরুত্ব অনুযায়ী সাজাতে হয় ।

প্রবন্ধ লেখার আগে তাই তােমার এলােমেলাে সংকেতসূত্রগুলাে ধারাবাহিকভাবে সাজিয়ে নেবে ।

৩. প্রবন্ধ রচনার একটা সাধারণ কাঠামাে রয়েছে ।

এর তিনটি অংশ : ভূমিকা , মূল অংশ ও উপসংহার ।

প্রবন্ধ রচনার সময় এই কাঠামাে অনুসরণ করা দরকার ।

প্রবন্ধের কাঠামাে

প্রবন্ধের সাধারণত তিনটি প্রধান অংশ থাকে ।

(ক) ভূমিকা , (খ) মূল অংশ ও (গ) উপসংহার ।

ক. ভূমিকা : প্রবন্ধের প্রথম অনুচ্ছেদটি হবে এর ভূমিকা বা সূচনা । ভূমিকা হচ্ছে প্রবন্ধের সূচনা অংশ । অনেকটা বিষয়ে ঢােকার দরজার মতাে ।

ভূমিকা যত বিষয় – অনুযায়ী , আকর্ষণীয় ও মনােরম হয় ততই ভালাে ।

লক্ষ রাখা দরকার , ভূমিকা অংশে যেন অপ্রয়ােজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য ভিড় না করে আর তা যেন খুব দীর্ঘ না হয় ।

খ. মূল অংশ : এটি প্রবন্ধের মধ্যভাগ। প্রবন্ধের মূল বক্তব্য এখানে কয়েকটি অনুচ্ছেদে উপস্থাপন করা হয় । এজন্যে প্রথমে মনে মনে ছক করে নেওয়া ভালাে । কাগজে খসড়া করেও নেওয়া চলে ।

প্রতিটি অনুচ্ছেদের শুরুতে প্রয়ােজনে সংকেত বা পয়েন্ট লেখা যেতে পারে ।

সংকেতগুলাে গুরুত্ব অনুযায়ী একের পর এক সাজাতে হয় ।

গ. উপসংহার : ভূমিকা থেকে শুরু করে রচনার মধ্যাংশে এসে রচনা যে ভাবব্যঞ্জনা পায় তা শেষ করতে হয় উপসংহারে । এদিক থেকে উপসংহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ । উপসংহারে অল্প কথায় সমাপ্তিসূচক ভাব প্রকাশ ভালাে । তাতে রচনা হয় সার্থক ।

উপসংহারে কখনাে কখনাে ব্যক্তিগত অভিমত প্রকাশ করাও চলে । প্রাসঙ্গিক সমস্যা উত্তরণে আশাবাদ বা প্রত্যাশাও ব্যক্ত করা যেতে পারে ।

প্রবন্ধ রচনার দক্ষতা আসবে যেভাবে:

প্রবন্ধ রচনায় রাতারাতি কেউ দক্ষতা অর্জন করতে পারে না ।

এজন্যে নিয়মিত অনুশীলনের প্রয়ােজন হয় । এক্ষেত্রে নিচের নির্দেশনাগুলাে অনুসরণ করা দরকার :

১. নামকরা লেখকদের প্রবন্ধ পড়া উচিত । লেখক কী বলেছেন , কীভাবে বলেছেন তা খুঁটিয়ে লক্ষ করা ভালাে । পত্র পত্রিকায় কোনাে বিষয়ে প্রবন্ধ চোখ পড়লে তা পড়া উচিত । এতে ধারণা বিকশিত হয় এবং শব্দভাণ্ডার বাড়ে ।

২. প্রবন্ধে কথার ফুলঝুরি কিংবা অপ্রয়ােজনীয় বাড়তি কথা পরিহার করা উচিত । এই কথা যেন বার বার বলা হয় । অল্প কথায় ভাব প্রকাশ করতে হবে ।

তাতে এই গুণ অর্জনের জন্যে সারাংশ ও সারমর্ম লেখার অভ্যাস করা ভালাে ।

৩. অনেক সময় চিন্তামূলক প্রবন্ধ সংহত কথাকে ব্যাখ্যা – বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশদ করতে হয় ।

ভাবসম্প্রসারণ প্রক্রিয়া আয়ত্ত করলে তা এক্ষেত্রে কাজে লাগে । ভালাে প্রবন্ধ লেখার জন্যে ভাষার ওপর সহজ দক্ষতা থাকতে হয় ।

৪. সহজ , সরল ও ছােটো ছােটো বাক্যে প্রবন্ধ লেখার অভ্যাস করবে । তাতে দক্ষতা আসবে ।

মনে রাখবে , চিন্তামূলক প্রবন্ধের ভাষা হবে ভাবগম্ভীর আর লঘু প্রবন্ধের ভাষা হবে হালকা চালের ।

৫. প্রবন্ধ রচনায় সবসময় প্রাসঙ্গিক বিষয় , চিন্তা ও তথ্যকেই গুরুত্ব দেবে । মূল বিষয় থেকে কখনাে দূরে যাবে না ।

৬. ভাষারীতির ক্ষেত্রে কখনাে চলিত ও সাধু রীতি মিশিয়ে ফেলবে না । আধুনিক কালে চলিত রীতিই প্রাধান্য ও গুরুত্ব পাচ্ছে । তাই চলিত রীতিতে প্রবন্ধ লেখাই ভালাে ।

৭. প্রবন্ধের উৎকর্ষ নির্ভর করে নির্ভুল বানান ও বাক্যের শুদ্ধ প্রয়ােগের ওপর । এ বিষয়ে সব সময় সজাগ ও সতর্ক থাকা দরকার ।

৮. প্রবন্ধে প্রাসঙ্গিক ও সংক্ষিপ্ত উদ্ধৃতি এবং প্রবাদ – প্রবচন ব্যবহার করা ভালাে । অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি কখনাে ব্যবহার করা উচিত নয় । বেশি বেশি উদ্ধৃতি ব্যবহারও ভালাে প্রবন্ধের লক্ষণ নয় ।

৯. চিন্তামূলক রচনায় সংকেতসূত্র উল্লেখ করবে । বর্ণনামূলক রচনায় সংকেতসূত্র উল্লেখ করার দরকার নেই ।

১০. যতটা সম্ভব নিজের ভাষায় সুন্দরভাবে গুছিয়ে নির্ভুলভাবে প্রবন্ধ লেখার অভ্যাস করতে হবে । এতেই দক্ষতা আসৰে । কোনাে ছক বাঁধা নিয়মে সার্থক রচনা লেখা যায় না ।

Leave a Comment