রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র: পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও বাংলাদেশ (সমস্যা ও সম্ভাবনা)

আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার বিদ্যুৎ মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক কালজয়ী অধ্যায়ের সূচনা করেছে । আমাদের ব্যক্তিজীবনের কাজকর্ম , বিনােদন , আরাম – আয়েশ সব কিছুই সম্ভব হয়েছে একমাত্র বিদ্যুতের কারণে । কিন্তু বিদ্যুতের অভাবে আমাদের জীবন নিষ্প্রাণ , নিষ্ফল ও অর্থহীন হয়ে পড়ে । মােটকথা , আধুনিক জীবনের সবক্ষেত্রে বিদ্যুৎশক্তিই হলাে সাফল্যের চাবিকাঠি ।

পরমাণু বিদ্যুৎ কী?

পরমাণু বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় । এ প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত ইউরেনিয়াম অথবা থােরিয়াম – এর নিউক্লিয়াস ভেঙে দুটি ক্ষুদ্রতম অংশে বিভক্ত হয়ে শক্তি সৃষ্টি করে এবং দুটি অথবা তিনটি নিউট্রন নির্গত করে । এ ফিউশান পদ্ধতির মাধ্যমে চেইন রিঅ্যাকশন সৃষ্টি করা যায় ।

ফলে এই শক্তি এক বিরাট তাপের সৃষ্টি করে যাকে পরবর্তী সময়ে বিদ্যুতে পরিণত করা যায় । এ বিদ্যুৎকেই পরমাণু বিদ্যুৎ বলা হয় । এর শক্তি এত বেশি যে এক কিলােগ্রাম ইউরেনিয়ামে যে শক্তি তা দুই হাজার ৫০০ টন কয়লা পােড়ালে যে শক্তি হবে তার সমান । এ পদ্ধতি অত্যন্ত কঠিন , জটিল ও বিপজ্জনক । এর জন্য দরকার দক্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবশ্য এর ব্যতিক্রম ঘটিয়ে নিউক্লিয়ার বােমা তৈরি করা হয়েছিল । তার পরপরই ১৯৫০ – এর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ার ‘Atom For Peace’ অর্থাৎ শান্তির জন্য অ্যাটম কর্মসূচি হাতে নেন । ফলে গড়ে ওঠে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা । এর তত্ত্বাবধানে পরবর্তী সময়ে আণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার হয় পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন ।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালেই বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে । এর পর থেকে আণবিক শক্তি সংস্থা বহুভাবে বহুমাত্রিক সাহায্য করে যাচ্ছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনকে ।

পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে আমেরিকা , ফ্রান্স , জাপান , কোরিয়া , চীন , তুরস্ক এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে । পরমাণু বিদ্যুতের প্রয়ােজনীয়তা শুধু যে আজকের প্রতিপাদ্য , তা নয় – স্বাধীনতা পূর্ব বাংলাদেশে এর প্রয়ােজনীয়তার কথা আমাদের দেশের পরমাণু বিজ্ঞানীরা বলেছেন । এমনকি পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশন যখন ১৯৬১ সালে পারমাণবিক বিদ্যুতের বিষয় মাথায় আনে , তখন থেকেই বিষয়টি প্রাধান্য পায় ।আধুনিক ব্যাকরণ ও নির্মিতি পাকিস্তানে পারমাণবিক বিদ্যুতের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ইন্টারনিউক্লিয়ার কোম্পানি এবং গিরস অ্যান্ড হিল ইন করপােরেটড অব আমেরিকা কাজে লাগানাে হয়েছিল । তারা তাদের রিপাের্ট তদানীন্তন পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনের কাছে জমা দেন । তাতে বলা হয় পূর্ব পাকিস্তানে পদ্মা নদীর তীরে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশে পাবনার রূপপুরে কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রকল্প গ্রহণ বাস্তবসম্মত ।

কিন্তু পাকিস্তান সরকার ঔপনিবেশিক মনােভাবের কারণে চেয়েছিল এটা করাচিতে স্থাপিত হােক । স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম সুপারিশ করে ওয়াকিং সুপ । ১৯৮৪-৮৫ সালে ফ্রেন্স পাওয়ার রিঅ্যাক্টর এবং জাপানি টারবাে জেনারেটর স্থাপন প্রক্রিয়া শুরু করে । আশির দশকের প্রথমার্ধে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প জাতীয় চাহিদা হিসেবে দেখা যায় । এরপর আবার রাশিয়ার সাহায্যে প্রস্তাব বিবেচনায় আনা হয় । কিন্তু চেরনােবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর সব ভেস্তে যায় । এ দেশে সােচ্চার হলাে পারমাণবিক বিদ্যুৎবিরােধী কিছু বুদ্ধিজীবী এবং বিজ্ঞানী ।

বাংলাদেশ ও রাশিয়া পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষর:

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কাঙ্ক্ষিত স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও এর যথােপযুক্ত ব্যবহারে বিশেষ নজর দিচ্ছে । বর্তমানে দেশের মােট জনসংখ্যার মাত্র ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় রয়েছে । দেশে বর্তমানে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ৩২১ কিলােওয়াট ঘণ্টা । যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম । এ অবস্থার প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেকগুলাে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বাণিজ্যিকভাবে চালু করেছে । পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার রাশিয়ার সাথে ২০০৯ সালে ১৩ মে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষর করে । যাতে বলা হয় ১ হাজার মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে । এতে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয় ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার । ২০০৯ সালের ২১ মে মস্কোয় বাংলাদেশ ও রাশিয়া পরমাণু জ্বালানির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহযােগিতা কাঠামাে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয় ।

পরমাণু জ্বালানির সম্ভাবনা:

পরমাণু জ্বালানি সম্পর্কে বলা হয় এ জ্বালানির মাধ্যমে কার্বন নির্গমন হয় কম । যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে না । ভারতে কয়লা পােড়ানাের ফলে সেখানে কার্বন নির্গমন এক বছরে ২৭৯ দশমিক ৬১ ও বাংলাদেশে ৮ দশমিক ৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন , পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলাে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন । আর এই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে আলােকিত হবে বাংলাদেশ ।

এই বিদ্যুৎ পৌছে যাবে গ্রাম থেকে গ্রামে । পারমাণবিক জ্বালানির অসুবিধা : পারমাণবিক চুল্লির যেমন সুবিধা রয়েছে তেমনি রয়েছে অসুবিধাও । একটি পারমাণবিক শক্তির চুল্লি স্থাপনের পূর্বে অঞ্চলের পরিবেশ , ভূকম্পন প্রবণতা , হাইড্রোলজি , আবহাওয়াবিদ্যা , জনসংখ্যা এবং শিলু পরিবহন ও সামরিক স্থাপনাসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে । এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ড , বিস্ফোরণ , বিকিরণ ও দুর্ঘটনার কারণে মহাবিপর্যয় ঘটতে পারে । পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণে আন্তর্জাতিক মানের নিউক্লিয়ার বিশেষজ্ঞ প্রয়ােজন । পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনার ফলে ক্যান্সারজনিত রােগের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করে ।

যেসব স্থানে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে সেসব স্থানে জন্ম নেয়া সকল শিশুই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয় । জমির উর্বরতা চিরদিনের জন্য বিনিষ্ট হয় । পারমাণবিক চুল্লিতে রাসায়নিক বিক্রিয়ার পর সৃষ্ট হয় তেজস্ক্রিয় বর্জ্য যা জীবজগৎ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক । যতই নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হােক না কেন তার পরেও প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও কারিগরি ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমবেশি থেকে যায় ।

পারমাণবিক শক্তির প্রধান উৎস ইউরেনিয়াম । বৈজ্ঞানিকদের ধারণা , আগামী ৪০ থেকে ৬০ বছর পর আর ইউরেনিয়াম পাওয়া যাবে না । পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ খুবই ব্যয়বহুল ব্যাপার।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদা :

বিশ্বের মােট উৎপাদিত বিদ্যুতের ১৬ % আসে পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে । বিশ্বের ৩১ টি দেশের ৪৪০ টি পারমাণবিক চুল্লিতে এই বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে । যুক্তরাষ্ট্রের একারই রয়েছে ১০৪ টি রিয়েক্টর যেখানে উৎপাদন হার তাদের ২০% বিদ্যুৎ । ফ্রান্সে ৫৯ টি রিয়েক্টর দেশের মােট উৎপাদনের ৭৮% বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ।

বর্তমানে যেসব দেশে আরাে রিয়েক্টর নির্মাণাধীন রয়েছে , তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চীন ও ভারত । ভারতে বর্তমানে ২০ টি পরমাণু চুল্লি রয়েছে । যার একটি বাদে সবকটি চালু রয়েছে ।

বর্তমানে ভারতের মাত্র ৩ শতাংশ চাহিদা মােট পরমাণু বিদ্যুতে , বেলজিয়ামের ৫৮ টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছে ৫৮% শতাংশ । চীন এ খাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে ৯ হাজার মেগাওয়াট । পাকিস্তান ৪২৫ মেগাওয়াট । ২০২০ সালের মধ্যে পাকিস্তান সাত হাজার , ভারত ২০ হাজার এবং চীন ৪০ হাজার মেগাওয়াটের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করবে ।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠেছে । এমতাবস্থায় এ সংকট মােকাবিলায় বাংলাদেশকে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে দুত যেতে হবে ।

আর এর জন্য যা প্রয়ােজন তা হলাে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে চুক্তি স্বাক্ষরের পর সফল বাস্তবায়নে সকলের ঐকান্তিক ও সহযােগিতা ।

Leave a Comment