পরীক্ষার পূর্বরাত্রী – পরীক্ষার পূর্বের রাত

সময় থেমে থাকে না । তবে জীবন সময়ের স্রোতে ভেসে এগিয়ে চলে সামনের দিকে । এরই মধ্যে ঘটে অনেক ঘটনা । তার মধ্যে পরীক্ষা অন্যতম ।

পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া কত পরীক্ষা দিয়েছি । কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষা হলে কিনা আর শােক তাপ দিয়ে সেটা যদি হয় পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষা তবে তাে কথাই নেই । কাল আমার সেই কঠিন পরীক্ষা ।

পদার্থ বিজ্ঞানের মােটা বইটা নিয়ে বসে আছি পড়ার টেবিলে । মনে আশঙ্কা পারব তাে সব পড়া শেষ করতে । আমি পড়ছি সেই সাথে বাড়ছে রাত । একটু ঘুম ঘুম ভাব হলাে । চোখের সামনে বইয়ের লেখাগুলাে দেখে মনে হচ্ছে নতুন করে পড়তে বসেছি । ক্লাসে শিক্ষকের লম্বা লেকচারগুলাের কথা এখন খুব মনে পড়ছে ।

আর পড়বেই তাে , তখন তাে সব কথা এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করেছি । যদি একটু মনােযােগ দিয়ে শুনতাম !

রাত বাজে বারােটা । দু – তিন মিনিট পড়ছি আর বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করছি । পরীক্ষা ভালাে হবে তাে ? এক লাইন মুখস্থ হলেই তার আগের লাইন ভুলে যাচ্ছি । এরই মধ্যে শুরু হলাে মশার যন্ত্রণা । কানের কাছে অনবরত পিনপিন করেই যাচ্ছে ।

আর্কিমিডিসের সূত্রগুলাের দিকে এক ঝলক তাকাতেই মনে হলাে , কী দরকার ছিল বিজ্ঞানীদের এতকিছু আবিষ্কার করার ।

যদি এসব না হতাে তাহলে এ যুগের শিক্ষার্থীদের এত কষ্ট করতে হতাে না । বিশেষ করে আমার ।

মা এক গ্লাস দুধ নিয়ে এসে বললেন দ্রুত শুয়ে পড়তে । বাবা বলেছিলেন পরীক্ষার আগে পর্যাপ্ত ঘুম দরকার । বেশি রাত জাগলে নাকি মস্তিষ্কে চাপ পড়ে । ফলে পরীক্ষা খারাপ হয় ।

কিন্তু এখন সেই উপদেশ মানতে গেলে পরীক্ষায় দুটো গােল্লা ছাড়া কিছুই অর্জন করা যাবে না । নিজের অবস্থা দেখে নিজেরই হাসি পাচ্ছে । আচ্ছা আমার বন্ধুরা এখন কী কাছে ? আকাশে সােনার থালার মতাে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে । টেবিলের পাশের জানালা দিয়ে অমন মনােরম দৃশ্য দেখে কবিতার লাইন মনে পড়ে যাচ্ছিল । আর অমনি চাদটা টুপ করে এক টুকরাে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে গেল ।

হয়তাে বােঝাতে চাচ্ছে , আমার পূর্ণিমা দেখে সময় নষ্ট না করে পড়াশােনায় ডুব দেয়া উচিত । কিন্তু তা পারলে তাে হতােই । পড়া তাে দূরের কথা , অদ্ভুত সব চিন্তা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে ।

আচ্ছা , নিউটনও তাে সতেরো – আঠারাে বছর বয়স পর্যন্ত খারাপ ছাত্র ছিলেন । তিনি যদি এত বড় বিজ্ঞানী হতে পারেন , আমি নিশ্চয়ই ছােটখাটো ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে পারবোঊ !

আমাদের ক্লাসের আরীব বােধহয় এতক্ষণে নাক ডেকে ঘুমােচ্ছে । সে তাে পদার্থ বিজ্ঞানে নব্বইয়ের নিচে পায়ই না । স্যার ওকে যে রকম আদর করেন , দেখলে হিংসায় গা জ্বলে যায় । যাক গে , এসব মনে করলে এখন শুধু মনােষ্টেই ভুগতে হবে ।

তার চেয়ে বন্ধুর কাছ থেকে নেয়া নােটগুলাের দিকে একবার চোখ বুলানাে যাক । পরীক্ষার সিট যে কার পাশে পড়বে কে জানে ! বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তরই এতাে বড় বড় , সময়মতাে শেষ করতে না পারলে অবস্যা টাইট । আহ ! স্যার বলতেন তাদের সময় নাকি এতকিছু পড়তে হতো না , তাই পড়ার চাপও কম ছিল । কী মজাই না ছিল সে সময় ।

বসে থাকতে থাকতে পায়ে ঝি ঝি ধরে যাচ্ছিল । তাই বই নিয়ে হেঁটে হেঁটে পড়া শুরু করলাম । দেখি এ পন্থা প্রয়ােগ করে কোনাে কিছু মাথায় ঢােকাতে পারি কি না । আশপাশের বাড়িগুলাে সব অন্ধকার । সবাই নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে । চারদিকে পিনপতন নীরবতা ।

এমন জ্যোৎস্না রাতে চাঁদের আলােয় আলােকিত পৃথিবীকে যে এত রহস্যময় লাগে তা আগে কখনাে খেয়াল করিনি । কী বিপদ ! পরীক্ষার আগের রাতেই এমন সুন্দর সব দৃশ্য চোখে ধরা দিতে হয় !

হঠাৎ করে ঘর অন্ধকার হয়ে গেল । অর্থাৎ লোডশেডিং । শহরে লােডশেডিং হবে না , এটা অসম্ভব । রান্নাঘর থেকে অনেক কষ্টে একটা মােমবাতি জ্বালিয়ে আনলাম । কী আর করা । এর মধ্যেই এখন পড়তে হবে । মশাদের পিনপিন আরও বেড়ে গেল । অন্ধকারে আমাকে পেয়ে মশারা দলবল নিয়ে আসতে শুরু করেছে । পােকামাকড়দের কত মজা , স্কুলও নেই , পরীক্ষাও দিতে হয় না । পড়তে পড়তে হঠাৎ চোখে পড়ল টেবিলে রাখা গ্লাসটির ওপর দুধটা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে ।

মা আমার জন্যে কিছুক্ষণ জেগে থেকে অবশেষে ঘুমিয়ে পড়েছেন । বাবা – মা দুজনেরই তাে সকালে অফিস । আমারও চোখ জড়িয়ে আসছে ঘুমে ।

আচ্ছা , বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলাে একবার দেখে নেই । তারপর ঘুমিয়ে পড়ব ।

স্যার এসে একটা প্রশ্নপত্র দিয়ে গেলেন । পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টা পড়ল । আমি প্রশ্নগুলােতে বার বার চোখ বােলাচ্ছি , কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না । গতরাতে যা পড়েছি তার সাথে এ প্রশ্নের কোনাে মিল নেই । এটা কোন ভাষা ! চাইনিজদের লেখার মতাে । আর আমার চারপাশে সবাই ফটাফট লিখে চলেছে । কেবল আমি কলম হাতে নিয়ে অসহায় বসে আছি । অবশেষে উত্তরপত্রে নিজের নামটা লিখলাম । আর তখনই উত্তরপত্র জমা দেবার ঘণ্টা বেজে উঠল ।

আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম । এত তাড়াতাড়ি সময় শেষ ! আমি যে খাতায় একটি শব্দও লিখিনি । স্কুলের ঘাটাটাও তাে বন্ধ হচ্ছে না । একটানা বেজেই চলেছে ।

কী আশ্চর্য এখানে মা এলাে কোথেকে ! চোখ খুলতেই দেখি মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমাকে ডাকছেন । অ্যালার্ম ঘড়িটাও বেজে চলেছে । ঘরময় লুটোপুটি খাচ্ছে মিষ্টি রােদ । মাথার পাশে আমার পদার্থ বিজ্ঞানের বই । স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আমি । পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । আর সেই ভীতিকর ঘটনাটি ছিল আমার অবচেতন মনের একটা দীর্ঘ দূ:স্বপ্ন।

Leave a Comment